জাপানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি

প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
জাপানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো—দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচিত করেছে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে। মঙ্গলবার টোকিওতে অনুষ্ঠিত ভোটে তাকাইচি নির্বাচিত হন জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। দীর্ঘদিন পুরুষপ্রধান রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রে প্রভাবশালী পুরুষদের দখলে থাকা এই সমাজে তার নেতৃত্ব পাওয়া এক ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে মনে করা হচ্ছে।

৬৪ বছর বয়সী এই রক্ষণশীল রাজনীতিক জাপানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাপান সফরের কয়েকদিন আগেই তার ক্ষমতায় আসা আন্তর্জাতিকভাবে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তাকাইচি তার জীবনযাত্রায় যেমন অনন্য, তেমনি চিন্তাধারায়ও ব্যতিক্রমী। একসময়কার টেলিভিশন উপস্থাপক থেকে জাপানের রক্ষণশীল রাজনীতির মুখ হয়ে ওঠা এই নারী একদিকে ভারী মোটরসাইকেল চালাতে ও হেভি মেটাল ড্রাম বাজাতে ভালোবাসেন, অন্যদিকে তিনি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত। আবের মতো তাকাইচিও জাপানের সংবিধানের শান্তিবাদী ধারা সংশোধনের পক্ষে এবং বিতর্কিত ইয়াসুকুনি যুদ্ধ স্মৃতিসৌধে গিয়েছেন, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের নামও অন্তর্ভুক্ত। এই অবস্থান নিয়ে প্রতিবেশী চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।

তাকাইচি সমলিঙ্গ বিবাহের বিরোধী এবং দম্পতিদের আলাদা পদবি ব্যবহারের আন্দোলনেরও সমর্থন দেন না—যা আধুনিক জাপানের উদার সমাজে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

রাজনৈতিক যাত্রা ও পটভূমি

তাকাইচি জাপানের নারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তার বাবা গাড়ি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন এবং মা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি মার্কিন কংগ্রেসের এক ডেমোক্র্যাট সদস্যের অধীনে ইন্টার্নশিপ করেন এবং পরে টেলিভিশন ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেন।

এরপর তিনি জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-তে যোগ দেন। নয়বার পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি দলীয় নীতি গবেষণা কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। সর্বশেষ তিনি প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার মন্ত্রিসভায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রী ছিলেন।

চলতি অক্টোবরের শুরুতে তিনি এলডিপির সভাপতি নির্বাচিত হন, যেখানে তিনি দলটির মধ্যপন্থী প্রার্থীদের পরাজিত করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, তার নেতৃত্বে দলটি আবারও রক্ষণশীল ধারায় ফিরছে।

চ্যালেঞ্জ ও নতুন জোট

দলটির সাম্প্রতিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এবং ভোটে ভরাডুবির পর এলডিপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ফলে তাকাইচির জন্য ক্ষমতার পথে বাধা ছিল কঠিন। পুরোনো জোটসঙ্গী কোমেইতো পার্টি সমর্থন প্রত্যাহার করায় তাকাইচি নতুন করে জোট বাঁধেন নিপ্পন ইশিন (জাপান ইনোভেশন পার্টি)-এর সঙ্গে।

এই দলটি কঠোর অভিবাসন নীতি ও সংসদ সদস্য সংখ্যা ১০ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে জোটে যোগ দেয়। তবে তাদের বিশেষ দাবি, ওসাকাকে জাপানের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া—যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিতর্কের কারণ হতে পারে।

অর্থনীতি ও জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার

ক্ষমতায় আসার পর তাকাইচির প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন। জাপানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম, বিশেষ করে চালের মূল্য গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের জন্মহার কমে যাওয়া, কর্মশক্তি সংকট ও বৃদ্ধ জনসংখ্যার চাপ অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করছে।

জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারও তাকাইচির জন্য বড় পরীক্ষা। সাম্প্রতিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারির পর এলডিপি ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকটে পড়েছে। গত পাঁচ বছরে চারজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের পর তাকাইচিকে “জাপানের আয়রন লেডি” বলা হলেও, টিকে থাকতে হলে তাকে খুব দ্রুত ফল দেখাতে হবে—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মজবুত করা এবং নিজের দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনের মাধ্যমে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জাপানের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক আসনে বসলেও তাকাইচির সামনে পথ মোটেও মসৃণ নয়। তার নেতৃত্বে জাপান কতটা স্থিতিশীলতা ফিরে পাবে, সেটিই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *