নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
বাংলাদেশের নদীবেষ্টিত ভূগোল আমাদের সৌন্দর্যের সম্পদ, আবার একই সঙ্গে বঞ্চনার ঐতিহাসিক দলিল। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ জেলা ভোলা সেই বঞ্চনার বাস্তব উদাহরণ। জনসংখ্যা, অর্থনীতি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সব দিক দিয়েই ভোলা আজ আর পিছিয়ে নেই; কিন্তু অবকাঠামোগত সংযোগহীনতা এই জেলার উন্নয়নকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে। বহু বছর ধরেই ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন রূপরেখার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হলেও, নীতিনির্ধারকদের অনীহা ও দোদুল্যমান অবস্থান পুরো এলাকার মানুষকে হতাশ করে তুলেছে।
এমন বাস্তবতায় ভোলা বাসীর পাঁচদফা দাবির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মাণের দাবিতে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ নাগরিকদের পায়ে হেঁটে, নদী সাঁতরে ঢাকাগামী ঐতিহাসিক লংমার্চ নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ। তাদের দাবি, তাদের বঞ্চনা ও তাদের মৌলিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম-সবকিছুই এই লংমার্চকে একটি প্রতীকী আন্দোলনে রূপ দিয়েছে।
একটি সেতুর জন্য এত লড়াই কেন?
ভোলা দেশের একমাত্র জেলা যার সঙ্গে সড়কপথে মূল ভূখণ্ডের কোনো সরাসরি সংযোগ নেই। ফেরি ও লঞ্চ রুটের ওপর পুরো পরিবহন নির্ভরশীলতা শুধু মানুষের যাত্রা নয়—অর্থনীতি, পর্যটন, কৃষিপণ্য পরিবহন, মাছ রপ্তানি, চিকিৎসা ও জরুরি সেবাকেও অনিশ্চয়তার মাঝে রেখেছে।
প্রতিবছর শীত-বর্ষায় অসংখ্য যাত্রী রুট বন্ধ, দেরি, ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার ও দুর্ঘটনার শিকার হন। এমন পরিস্থিতিতে ভোলা-বরিশাল সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়-এটি বহু সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।
ভোলায় যে পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত আছে, ভোলার সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ, কৃষিপণ্য ও কৃষি-নির্ভর শিল্প-সবই পুরো দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও পর্যটন বিকাশ প্রত্যাশা মতো এগোতে পারছে না।
এ অবস্থায় যখন নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ‘অনীহা’, ‘সময় লাগবে’, ‘বিকল্প চিন্তা’-এমন বার্তা আসে, তখন ভোলার মানুষের মনে ক্ষোভ জন্মানো খুব স্বাভাবিক।
উপদেষ্টাদের ভোলা সফর কেন এত প্রতীকী?
ভোলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করেছে-কেবল ঢাকায় বসে ফাইল দেখে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না, নীতিনির্ধারকদের ভোলার বাস্তবতা দেখতে হবে।
সেই হিসাবে সরকার–দলীয় উপদেষ্টাদের ভোলা সফর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু সফর শেষে যখন কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত কিংবা আশ্বাসের পরিবর্তে আবারও কৌশলী ‘গড়িমসি’ দেখা যায়-তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে:
“ভোলার অবস্থা দেখিয়ে শুধু রাজনৈতিক নাটক সাজানো হলো, নাকি প্রকৃত অর্থে উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া হলো?”
মানুষ মনে করে-যদি প্রকৃত আন্তরিকতা থাকত, তাহলে সফরের আগে–পরে পুরো প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট ও ফলপ্রসূ হত। উন্নয়ন প্রকল্পের নীলনকশা, সময়সীমা ও আর্থিক কাঠামো নিয়ে একটিও নির্দিষ্ট বক্তব্য না থাকায় সাধারণ মানুষ এই সফরকে ‘চোখে ধুলো দেওয়া’ হিসেবেই দেখেছে।
ভোলার সম্পদ নিয়ে আগ্রহ, কিন্তু উন্নয়ন নিয়ে অনীহা-এ দ্বৈততা কেন?
ভোলার মানুষ ক্ষুব্ধ-কারণ তারা বিশ্বাস করে, তাঁদের সম্পদ সরকার ও বিভিন্ন শক্তি আহরণে আগ্রহী, কিন্তু ভোলার উন্নয়ন, যোগাযোগ ও শিল্পায়ন নিয়ে ততটা আগ্রহ নেই।
একদিকে ভোলার গ্যাস দেশের বিভিন্ন শিল্পে সরবরাহ করা হচ্ছে বা করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ভোলা যেন ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপ’ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।
এটাই তাদের প্রশ্ন-
“সম্পদ নেবেন, কিন্তু সেতু দিবেন না-এ কেমন উন্নয়ন নীতি?”
এই প্রশ্নের জবাব না থাকায় ভোলাবাসীর হতাশা আজ ক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
লংমার্চ: মানুষের আত্মসংকল্পের দৃঢ় উদাহরণ
পায়ে হেঁটে, নদী সাঁতরে, হাজারো প্রতিবন্ধকতার মাঝেও শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ঢাকার দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে দৃশ্য দেশ দেখেছে-তা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
আজকের তরুণরা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে না-তারা মাঠে নেমে ‘অবকাঠামোগত ন্যায্যতা’ দাবি করছে। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান, দৃষ্টিতে দৃঢ়তা-এগুলোই দেখিয়েছে মানুষের প্রকৃত শক্তি।
মানুষের এই আত্মনিষ্ঠা প্রমাণ করে একটি সেতু শুধু উন্নয়নের দাবি নয়, এটি মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।
গাড়ির সামনে শুয়ে প্রতিবাদ-এ সাহসের মূল্যায়ন জরুরি
যাদের আমরা প্রায়শই ‘গ্রামের মানুষ’ ভেবে অবহেলা করি, তারাই দেখিয়ে দিলো—প্রয়োজনে তারা গাড়ির সামনে শুয়ে নিজেদের দাবি আদায়ে দাঁড়াতে পারে।
ভোলার অসংখ্য মানুষ সেদিন শোধরানোর মতো বার্তা দিয়েছে
“ভেবো না, আমরা চুপচাপ বসে থাকব। অধিকার আদায়ে আমরা জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত।”
এ সাহস নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আপনি হয়তো কঠোর ভাষায় বলেছেন-“আমি থাকলে পালিয়ে যাওয়া শিক্ষা দিতাম”-কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মানুষগুলো ভোলার আন্দোলনের মুখ ও শক্তি হয়ে উঠেছে।
সরকারের প্রতি কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন
১. কেন এত বছরেও ভোলা–বরিশাল সেতুর কোনো নিশ্চিত নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি?
২. কেন feasibility study বারবার স্থগিত বা পিছিয়ে যাচ্ছে?
৩. কেন উপদেষ্টা পর্যায়ের সফরও কোনো ফলপ্রসূ ঘোষণা ছাড়া শেষ হয়?
৪. কেন ভোলার সম্পদ আহরণে আগ্রহ বেশি, অথচ উন্নয়ন প্রকল্পে অনীহা?
৫. একটি সেতু কি সত্যিই সরকারের পক্ষের জন্য এত বড় ‘ঝুঁকি’ যে সেটা বারবার পিছিয়ে দিতে হবে?
এই প্রশ্নগুলো ভোলার মানুষের। এগুলো উপেক্ষা করলে রাষ্ট্র শুধু একটি জেলা নয়, একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চলকে পিছিয়ে দেবে।
ভোলার দাবিগুলো পূরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, পক্ষপাত নয়
একটি সেতু নির্মাণে অর্থ লাগে, পরিকল্পনা লাগে-এ কথা সত্যি। কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো অংশ চিরকাল বঞ্চিত থাকবে-এ কথা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট—এসব ঢাকায় হয়, আবার চট্টগ্রাম–সিলেটেও হয়। তাহলে দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম জেলার জন্য একটি সেতু কীভাবে ‘অসম্ভব’ হয়ে যায়?
ভোলার দাবি তাই রাজনৈতিক নয়-এটি উন্নয়ন, অর্থনীতি ও মানবিক ন্যায্যতার দাবি।
সমাধান: সেতুর বাস্তবসম্মত রূপরেখা ঘোষণা করা
সেতু নির্মাণ নিয়ে যদি সত্যিই আন্তরিকতা থাকে, তাহলে সরকারের উচিত—
- স্পষ্ট সময়সীমা সহ feasibility study প্রকাশ
- প্রকল্পের অর্থায়ন উৎস চূড়ান্ত করা
- পরিবেশ ও নদীভরাট রক্ষা পরিকল্পনা জানানো
- সেতুর মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়ন পরিকল্পনা ঘোষণা
- ভোলা-বরিশাল, ভোলা–লক্ষ্মীপুর উভয় দিকেই সম্ভাব্য সংযোগ রুট বিবেচনা করা
এই পদক্ষেপগুলোই দেখাবে যে সরকার সত্যিই ভোলার উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শেষ কথা
ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবি শুধু একটি জেলার স্বাধীন চলাচলের দাবি নয়-এটি উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তার দাবি। মানুষের লংমার্চ দেখিয়েছে-যারা বঞ্চনার শিকার, তারাই সবচেয়ে বেশি লড়াই করতে পারে।
সরকার যদি সত্যিই উন্নয়নকে সমতাভিত্তিক করতে চায়, তাহলে ভোলার মানুষের এই দীর্ঘদিনের আহ্বান-এখনই গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
ভোলা আর বঞ্চনার প্রতীক হতে চায় না-তারা চায় অগ্রগতির সেতু।