গুম-খুন, জুলাই হত্যাকাণ্ড: ডিজিএফআই, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির ৩৪ কর্মকর্তাসহ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গ্রেফতারি পরোয়ানা!

নিজস্ব প্রতিবেদন | ঢাকা |

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনায়, গুম-খুন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ডিজিএফআই, র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবির ৩৪ জন কর্মকর্তাসহ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই শেষে, ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি মো. শাহিনুল ইসলাম এর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ বুধবার সকালে এ আদেশ দেন।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে—২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধী দলের শতাধিক নেতাকর্মীকে গুম, বেআইনি আটক ও নির্যাতন করে হত্যা করা হয়, যার মূল পরিকল্পনা হয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার বিশেষ ইউনিট টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (TFI)জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (JIC) এর মাধ্যমে।

মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, এবং র‍্যাব, ডিজিএফআই, বিজিবি ও পুলিশের আরও ৩০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, এই কর্মকর্তারা রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর নির্যাতন, জোরপূর্বক নিখোঁজ, তথাকথিত “বন্দি জিজ্ঞাসাবাদে মৃত্যু” এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রামপুরায় গণহত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন।

আদালত নথি অনুযায়ী, রামপুরার ঘটনায় ২৮ জন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা এবং পরবর্তীতে লাশ গুম করা হয়। এর দায়ে বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলাও গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল।

“রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতা জনগণের নিরাপত্তার জন্য, ভয় দেখানোর জন্য নয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি রাষ্ট্রীয় অস্ত্র ব্যবহার করে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালায়, তা মানবতাবিরোধী অপরাধ।”

বিচারপতি আরও জানান, প্রাথমিক সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগগুলো “বিশ্বাসযোগ্য ও গুরুতর”, তাই আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

আদালত নির্দেশ দিয়েছে, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন অবিলম্বে আসামিদের গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে।
একই সঙ্গে আগামী ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

যদি আসামিরা আদালতে উপস্থিত না হন, তবে তাদের পলাতক ঘোষণা করে অনুপস্থিতিতেই বিচার প্রক্রিয়া চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সরকারের পতনের দাবিতে টানা আন্দোলনের সময় রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ, ও মুগদা এলাকায় ব্যাপক গুলি ও দমনপীড়নের ঘটনা ঘটে।
তৎকালীন বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানে কমপক্ষে ২৮ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে জানা যায়, আহতদের অনেককেই পরদিন থেকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এই ঘটনাগুলোই পরবর্তীতে “জুলাই হত্যা মামলা” নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থান পায়।

মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যানিটি মনিটর বাংলাদেশ’ এই রায়কে “বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে এক সাহসী পদক্ষেপ” বলে অভিহিত করেছে।
সংস্থার পরিচালক নুরজাহান পারভীন বলেন,

“এতদিন যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জনের খোঁজে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, আজ তাদের মধ্যে ন্যায়বিচারের এক আলোকরেখা দেখা দিয়েছে।”

দীর্ঘ সময় ধরে গুম, খুন ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অভিযোগের যে অন্ধকার অধ্যায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল, তা এবার আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন আলোকরেখা পেলো।
বিচারকগণ জানিয়েছেন—“ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলেও, অস্বীকার করা যাবে না।”

এখন পুরো জাতি তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে, যেখানে ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়ের ন্যায়বিচার রচিত হতে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *