নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাঙ্গন — ক্যাডেট কলেজসমূহে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে আগামী নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে। প্রতিবারের মতো এবারও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দেশের মোট ১২টি ক্যাডেট কলেজে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। ভর্তি প্রক্রিয়া ও পরীক্ষার সময়সূচি ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
🎓 আবেদনের সময়সূচি ও প্রক্রিয়া
অফিসিয়াল ওয়েবসাইট cadetcollegeadmission.army.mil.bd-এর মাধ্যমে ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ শুরু হবে, যা চলবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আবেদন ফি পরিশোধ করা যাবে মোবাইল ফাইন্যান্স সার্ভিস (যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট) ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।
এ বছর আবেদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। প্রার্থী বা অভিভাবক সরাসরি ওয়েবসাইটে গিয়ে ফরম পূরণ, ছবি ও স্বাক্ষর আপলোড এবং ফি প্রদান করতে পারবেন।
📖 যোগ্যতা ও শর্তাবলি
ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে।
- প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
- বয়স সর্বোচ্চ ১৩ বছর ৬ মাস হতে পারবে (২০২৬ সালের জানুয়ারি ১ তারিখ অনুযায়ী)।
- প্রার্থীকে ষষ্ঠ শ্রেণি (Class VI) অথবা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
- প্রার্থীকে শারীরিকভাবে সুস্থ, দৃষ্টি ও শ্রবণক্ষম হতে হবে।
ছেলেদের জন্য দেশের ৯টি এবং মেয়েদের জন্য ৩টি ক্যাডেট কলেজে আসনসংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে।
🧮 পরীক্ষার ধাপ ও সময়সূচি
ক্যাডেট কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় তিনটি ধাপ রয়েছে: লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) ও মেডিক্যাল টেস্ট।
✏️ লিখিত পরীক্ষা
লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, সকাল ১০:০০ টায় সারা দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে একযোগে।
বিষয়ভিত্তিক নম্বর বণ্টন হবে নিম্নরূপঃ
- বাংলা — ১০০
- ইংরেজি — ১০০
- গণিত — ৬০
- সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, আইকিউসহ) — ৪০
মোট — ৩০০ নম্বর।
প্রশ্ন হবে বর্ণনামূলক ও অবজেক্টিভ উভয় ধরণের। পরীক্ষার সময় ৩ ঘণ্টা।
🗣️ মৌখিক পরীক্ষা ও মেডিক্যাল টেস্ট
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জানুয়ারি মাসে মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষা নেওয়া হবে।
এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও সাধারণ জ্ঞান যাচাই করা হয়।
পরবর্তী ধাপে সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল বোর্ডের মাধ্যমে শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হবে।
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ ১৫ জানুয়ারি ২০২৬। নির্বাচিত প্রার্থীদের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
🏫 দেশের ক্যাডেট কলেজগুলোর তালিকা
ছেলেদের জন্য (৯টি)
- ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম
- মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, টাঙ্গাইল
- ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ
- রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ
- বরিশাল ক্যাডেট কলেজ
- সৈয়দপুর ক্যাডেট কলেজ, নীলফামারী
- মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ, ময়মনসিংহ
- কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ
- পাবনা ক্যাডেট কলেজ
মেয়েদের জন্য (৩টি)
- ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজ
- জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজ
- ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ
সিলেবাস ও প্রস্তুতির নির্দেশনা
ভর্তির সিলেবাস জাতীয় শিক্ষাক্রমের ষষ্ঠ শ্রেণির ভিত্তিতে তৈরি।
বিষয়সমূহ হলো— বাংলা, ইংরেজি ব্যাকরণ ও রচনা, গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, এবং সাধারণ জ্ঞান।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা জানান, পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্নপত্র ও মডেল টেস্ট অনুশীলন ভর্তিতে সফল হওয়ার মূল চাবিকাঠি।
অনেকে অনলাইন কোর্স, প্রস্তুতি বই (যেমন Ideal Cadet Admission Guide, Medha Cadet Prep Book ইত্যাদি) ও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের সহায়তা নিচ্ছেন।
🧭 ভর্তির বাস্তব চিত্র ও প্রতিযোগিতা
প্রতিবছর প্রায় ৩০–৩৫ হাজার শিক্ষার্থী আবেদন করে, যার মধ্যে ভর্তি সুযোগ পায় মাত্র ৬০০–৭০০ জনের মতো।
অর্থাৎ প্রতি ৫০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ জন সুযোগ পান ক্যাডেট কলেজে।
এই প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রস্তুতি ও অধ্যবসায়ের অনুপ্রেরণা জোগায়।
ক্যাডেট কলেজের লক্ষ্য ও গুরুত্ব
১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের এই বিশেষ শিক্ষা-ব্যবস্থা।
এরপর ধীরে ধীরে সারাদেশে ১২টি কলেজে বিস্তৃতি লাভ করে।
এই কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্য শিক্ষা নয়, বরং নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, ও মানবিক গুণাবলিতে গড়ে ওঠে।
বর্তমানে রাজনীতি, সেনাবাহিনী, প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
অভিভাবকদের প্রত্যাশা ও পরামর্শ
অনেক অভিভাবক সন্তানদের ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করাতে আগ্রহী। তবে প্রস্তুতির দীর্ঘ সময় এবং উচ্চ মানের প্রতিযোগিতা সামলাতে সঠিক পরিকল্পনা দরকার।
২০২৬ সালের ক্যাডেট কলেজ ভর্তি প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
দেশের এই মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়া মানে শুধু মানসম্মত শিক্ষা নয়, বরং দেশের নেতৃত্ব তৈরির এক গৌরবময় সূচনা।