এমপিও অনিশ্চয়তায় এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশ প্রাপ্ত ডাবল শিফটের নতুন শিক্ষকগণ

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

দেশের বিভিন্ন ডাবল শিফট অনুমোদিত বিদ্যালয়ে এনটিআরসিএ (NTRCA) মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শত শত নতুন শিক্ষক এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিয়োগপত্র হাতে পেলেও, এমপিও অনুমোদন না থাকায় তাদের নিয়োগপত্রে জেলা শিক্ষা অফিসার স্বাক্ষর করছেন না। কারণ হিসেবে বলছেন তাদের ডাবল শিফট এমপি অনুমোদন নেই। তাই ঢাকার শহরের কয়েকশত শিক্ষক পরেছেন চরম অনিশ্চয়তায়। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদের চাহিদা বিবেচনায় তাদেরকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছেন। উল্লেখ্য নিয়োগের জন্য সুপারিশের পূর্বেই প্রতিষ্ঠানে প্রাপ্যতা আছে কিনা সে বিষয়ে কাগজপত্র জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপ-পরিচালকের কার্যালয় যাচাই করেছেন।
রাজধানীর গেন্ডারিয়া, মিরপুর, উত্তরা, মতিঝিল, ডেমরা ও কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার ডাবল শিফট বিদ্যালয়ে সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত বহু শিক্ষক জানিয়েছেন, তারা এমপিও নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তারা বুঝতে পারছেন না যে আদৌ তাদের এমপিও হবে কিনা? এ বিষয়ে কোন সমস্যা থাকলে এনটিআরসিএ কেন তাদেরকে সুপারিশ করেছেন তারা সে বিষয়েও জানতে চান।

একজন শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন—
“আমরা এনটিআরসিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্র হাতে পেয়েছি, কিন্তু এমপিও অনুমোদন না থাকায় জেলা শিক্ষা অফিসার নিয়োগ পত্রে স্বাক্ষর করছেন না তাই এমপিও আবেদন করতে পারছি না। পরিবার চালানো নিয়ে চরম হতাশায় আছি।”
আরেকজন প্রধান শিক্ষক বলেন—
“দ্বিতীয় শিফট অনুমোদিত হলেও মন্ত্রণালয় বলছে, ‘আলাদা এমপিও কোড নেই’। এই অবস্থায় নতুন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হতে পারছেন না। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমও বিঘ্নিত হচ্ছে।”

নীতিগত জটিলতার শিকার শিক্ষকরা
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ২০২১ সালের এমপিও নীতিমালার ৮ ধারা অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানে একাধিক শিফট চালু থাকলে দ্বিতীয় শিফটের জন্য আলাদা এমপিও কোড দেওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবে ঢাকাসহ দেশের নানা জেলায় শত শত স্কুলে দুই শিফট অনুমোদিত রয়েছে— যেখানে দ্বিতীয় শিফটে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে এনটিআরসিএ-এর সুপারিশে।

ফলে এখন সমস্যার মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে:
যখন প্রতিষ্ঠানটি সরকার অনুমোদিত, শিক্ষক নিয়োগও বৈধ—তবে এমপিও বন্ধ কেন? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে ডাবল শিফট পদ্ধতি কার্যকর থাকলেও এর এমপিওভুক্তি, জনবল অনুমোদন এবং বেতন–ভাতা প্রদানে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে— “বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা–২০২১ এর ধারা–৮ সংশোধন বা বাতিলের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে, বিশেষ করে ডাবল শিফট অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের এমপিও জটিলতা নিরসনের জন্য।”
ডাবল শিফট: এক সময়ের সমাধান, এখন জটিলতার কারণ।
বাংলাদেশে শহরাঞ্চলের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ২০০০ সালের পর থেকে “ডাবল শিফট” পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়। একই ভবনে সকাল ও বিকেল দুই দফায় শ্রেণি পরিচালনার ফলে শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তৃত হয়, তবে প্রশাসনিক কাঠামোয় এটি জটিলতা সৃষ্টি করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (DSHE) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় আড়াই শতাধিক বিদ্যালয়ে ডাবল শিফট অনুমোদিত হলেও দ্বিতীয় শিফটের শিক্ষকরা এমপিওবঞ্চিতের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
‘জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা–২০২১’-এর ধারা ৮ অনুযায়ী—
“একটি প্রতিষ্ঠানে একাধিক শিফট পরিচালিত হলে পৃথক এমপিও কোড প্রদান করা হবে না।”
এই ধারাটিই বর্তমানে সর্বাধিক বিতর্কিত। শিক্ষকরা বলছেন, এই ধারা কার্যকর থাকলে দ্বিতীয় শিফটের শিক্ষকরা কখনোই এমপিওভুক্ত হতে পারবেন না।
অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে— আলাদা এমপিও কোডের অনুমোদন দিলে একই প্রতিষ্ঠানে দ্বৈত প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হবে এবং অর্থনৈতিক চাপও বাড়বে।

সূত্র বলছে, এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব শিক্ষা সচিবের টেবিলে রয়েছে, যেখানে দুটি বিকল্প প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে—

ধারা ৮ আংশিক সংশোধন করে ডাবল শিফটের দ্বিতীয় পালার জন্য সীমিত এমপিও অনুমোদন দেওয়া।
সম্পূর্ণ বাতিল করে প্রতিটি শিফটকে পৃথক প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

অন্যদিকে, মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন—
“একই ভবনে দুটি এমপিও কোড চালু করলে জবাবদিহি কঠিন হয়ে যাবে। মন্ত্রণালয় হয়তো শর্তসাপেক্ষে আংশিক অনুমোদনের দিকেই যাবে।”

শিক্ষক সমাজ এখন একটাই আশা করছে— ডাবল শিফট বাতিল না করে, বরং “বহাল রেখে এমপিও অনুমোদন” দেওয়া হোক।
কারণ, দেশে বহু বছর ধরে চলমান এ পদ্ধতি রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

একজন শিক্ষক সংগঠনের নেতা বলেন—
“আমরা চাই না শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন হোক। আমরা শুধু চাই— সরকারের অনুমোদিত ডাবল শিফটে যারা পড়াচ্ছেন, তাদের ন্যায্য এমপিও দেওয়া হোক।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *