দীর্ঘ ১৭ বছর পর মিডিয়ায় মুখ খুললেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, দেশে ফেরা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইঙ্গিত।

তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক

“নির্বাচনের সময় আমি দূরে থাকতে পারি না” — বিবিসি বাংলাকে তারেক রহমান

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত এই নেতা সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, দেশে ফেরা, নির্বাচন এবং দলীয় ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।

সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে— বিশেষত তাঁর দেশে প্রত্যাবর্তন ও নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণের ঘোষণা নিয়ে।

তারেক রহমান বলেন, “অনেকে বলে আমি নীরব ছিলাম, কিন্তু আসলে আমি কথা বলেছি। আমার বক্তব্য অনেক সময় প্রচার করা হয়নি। আদালতের কিছু নির্দেশনা ও সরকারি বিধিনিষেধের কারণে গণমাধ্যমে আমার বক্তব্য তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।”

তিনি দাবি করেন, ২০০৭ সালের পর থেকে সরকার তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত করে রাখে, যা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর ছিল। “আমি যুক্তরাজ্যে শারীরিকভাবে আছি, কিন্তু মনেপ্রাণে গত ১৭ বছর আমি বাংলাদেশের মানুষদের সঙ্গেই আছি,”— বলেন তিনি।

বিবিসি বাংলার সাংবাদিক জানতে চান, তিনি কি দেশে ফিরবেন? উত্তরে তারেক রহমান বলেন,

“সময় এসেছে, ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই দেশে ফিরব। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যেন নির্বাচনের সময় জনগণের পাশে থাকতে পারি।”

তাঁর এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেশে ফেরার সরাসরি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, এটি দলের মনোবল পুনর্গঠনের একটি প্রস্তুতিমূলক ঘোষণা।

সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “নির্বাচনের সময় আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী— রাজনীতি আর নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক।”

তবে প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁর আগ্রহের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,

“এটি আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি নির্ভর করবে দল ও দেশের জনগণের সিদ্ধান্তের ওপর। আমি একা কিছু নির্ধারণ করি না।”

তিনি আরও যোগ করেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এখন দলের মূল লক্ষ্য।

তারেক রহমান সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলন প্রসঙ্গে বলেন, “এই আন্দোলনের কোনো একক নেতা বা মাস্টারমাইন্ড ছিল না। এটি ছিল জনগণের আন্দোলন— ছাত্র, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, কৃষক, অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গঠিত।”তিনি দাবি করেন, এ আন্দোলন প্রমাণ করেছে জনগণই গণতন্ত্রের প্রকৃত মালিক, কোনো ব্যক্তি বা দল নয়।

সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভেতরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

“আমরা স্বীকার করি—দলে কিছু অভিযোগ এসেছে। প্রায় সাত হাজার অভিযোগের মধ্যে অনেকগুলো তদন্ত হয়েছে, কিছু সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আমরা দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে বিএনপি পুলিশ নয়, আইনের কাজ আইনই করবে।”

তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি নিজেকে সংস্কারের পথে রাখছে এবং ভবিষ্যতে ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে’ আরও শক্তিশালী করবে।

তারেক রহমান জানান, তিনি দেশে ফেরার পর বিএনপিকে “আধুনিক, তরুণ নেতৃত্বনির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক” রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে চান।“বিএনপি কোনো ব্যক্তির দল নয়। এটি জনগণের আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান। আমি চাই এই প্রতিষ্ঠান আবার জনগণের হাতেই ফিরে যাক।”তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতি এখন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা চাই পরিবর্তন—সহিংসতা বা প্রতিশোধ নয়, ন্যায্যতা ও গণতন্ত্রের পথে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সাক্ষাৎকার বিএনপি রাজনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। দীর্ঘদিন পর মিডিয়ায় আসা তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন।

তবে তাঁর দেশে ফেরা এবং সরাসরি নির্বাচনী অংশগ্রহণ কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করছে সরকারের অবস্থান ও আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তারেক রহমান যেন বিএনপির রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের ঘোষণা দিয়েছেন।দীর্ঘ নির্বাসন, নীরবতা ও বিতর্কের পর তাঁর এই প্রকাশ্য বক্তব্য রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন অপেক্ষায়—তারেক রহমান সত্যিই দেশে ফিরছেন কি না, আর ফিরলে বিএনপি কোন পথে হাঁটবে?

—সূত্র: বিবিসি বাংলা,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *