গত ৬ মাসে ভোলায় ২৬ তরুণীর অনশন, এর মধ্যে চরফ্যাশন উপজেলাতেই ঘটেছে সর্বাধিক ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৈতিক অবক্ষয়, বেকারত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এই প্রবণতার মূল কারণ।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ভোলা:
ভোলায় প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অনশন যেন নতুন সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। গত ছয় মাসে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ২৬ জন তরুণী প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের দাবিতে অনশন করেছেন। এর মধ্যে চরফ্যাশন উপজেলায় ঘটেছে সর্বাধিক ১১টি ঘটনা—যা উদ্বেগজনকভাবে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ ঘটনাতেই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে। সম্পর্কের এক পর্যায়ে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, কিন্তু বিয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করায় তরুণীরা বাধ্য হয়ে প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে অবস্থান নেন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হয়।
চরফ্যাশনে কেন বেশি?
চরফ্যাশন উপজেলা তুলনামূলকভাবে পশ্চাৎপদ এলাকা। এখানকার তরুণ-তরুণীদের মধ্যে শিক্ষার হার কম এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। স্থানীয় সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান বলেন, “চরাঞ্চলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরিবার ও সমাজের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তরুণরা এখন মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় দেয়, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা বোঝে না। ফলে প্রতারণা বা বিয়ের অস্বীকৃতি ঘটলেই মেয়েরা আত্মসম্মান রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে অনশন বেছে নিচ্ছে।”
সামাজিক অবক্ষয় নাকি ভালোবাসার বিকৃতি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত প্রেমের ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতার প্রতিফলন। সমাজবিজ্ঞানী রুবিনা সুলতানা বলেন, “যেখানে পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই, যৌনশিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ শেখানো হয় না, সেখানে এমন ঘটনা বেড়েই চলবে। এটি সামাজিক অবক্ষয়েরই লক্ষণ।”অন্যদিকে কিছু স্থানীয় অভিভাবক মনে করেন, প্রেমিকের বাড়িতে অনশন এখন যেন এক ধরনের সামাজিক চাপে বিয়ের কৌশল হয়ে উঠছে। এতে উভয় পক্ষের সম্মান ও জীবনের স্থিতি নষ্ট হচ্ছে।
প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ:
ভোলা জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, যা সমাজের জন্য ভালো নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে—যাতে তরুণদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।”
ভোলায় প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অনশন এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সামাজিক সংকেত। নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব—সব মিলিয়ে তরুণ সমাজের মানসিক ভারসাম্যে নেমেছে অস্থিরতা। সমাজকে এখনই ভাবতে হবে—এটি কেবল প্রেমের নয়, সামাজিক অবক্ষয়ের লাল সংকেত।