বাসাবাড়িতে আর গ্যাস সংযোগ নয়-জ্বালানি উপদেষ্টার ঘোষণা

বাসাবাড়িতে আর গ্যাস সংযোগ নয়-জ্বালানি উপদেষ্টার ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক | স্বউদেশ২৪.কম | ঢাকা, ৮ অক্টোবর ২০২৫

দেশে নতুন করে আর কোনো বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান । তিনি বলেন, “দেশে যত গ্যাস আছে, তা দিয়ে শিল্প, বিদ্যুৎ ও জরুরি খাত চালানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাই বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ আর সম্ভব নয়। এই ঘোষণার পর সাধারণ মানুষ ও গৃহস্থালি ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কারণ: সংকট, ব্যয় বাস্তবতা

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন প্রতিদিন প্রায় ২৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ চাহিদা এর দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে ঘাটতি পূরণ করতে বিদেশ থেকে এলএনজি (Liquefied Natural Gas) আমদানি করতে হচ্ছে, যার দাম স্থানীয় উৎপাদনের তুলনায় দশ গুণ বেশি। উপদেষ্টা জানান, “আমরা এখন যে গ্যাস ব্যবহার করছি তার বড় অংশই বিদেশ থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। এত ব্যয়বহুল গ্যাস বাসাবাড়িতে দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়।”

শিল্প বিদ্যুৎ খাতে অগ্রাধিকার

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে গ্যাসের ব্যবহারকে এখন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস দিয়ে শিল্প সচল না থাকলে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেজন্য সরকার গৃহস্থালি গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বন্ধ করে শিল্প, সারকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সংরক্ষিত রাখতে চাইছে।

অপচয় চুরি-বড় সমস্যা

বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ সংস্থার তথ্যমতে, দেশের পাইপলাইন নেটওয়ার্কে প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ গ্যাস হারিয়ে যায়  বা অবৈধভাবে ব্যবহৃত হয়। হাজার হাজার অবৈধ সংযোগও এখনো চিহ্নিত হয়নি। উপদেষ্টা বলেন, “অপচয় বন্ধ করতে না পারলে উৎপাদিত গ্যাসের বড় অংশ হারিয়ে যাবে। তাই নতুন সংযোগ দেওয়ার কোনো অর্থ নেই।”

বিকল্প হিসেবে এলপিজি বিদ্যুৎ

সরকার জানাচ্ছে, বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য এখন এলপিজি (LPG) ও বিদ্যুৎচালিত ইনডাকশন চুলা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে শহরাঞ্চলে এলপিজির সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি ও বৈদ্যুতিক রান্নার প্রচলন বাড়াতে ভর্তুকি ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, না হলে সাধারণ মানুষ ব্যয়ভার সামলাতে পারবে না।

জনগণের উদ্বেগ প্রতিক্রিয়া

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের অনেক গৃহস্থালি গ্রাহক বলছেন, “গ্যাস সংযোগ না থাকলে জীবনের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। সিলিন্ডার গ্যাস অনেক দামী।”তারা সরকারের কাছে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ও বিকল্প সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ মত

জ্বালানি বিশ্লেষক ড. শফিউল ইসলাম বলেন, “গ্যাস সম্পদ সীমিত, কিন্তু পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে। হঠাৎ সিদ্ধান্তে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারকে এলপিজি খাতকে সাশ্রয়ী করতে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে হবে।”

উপসংহার বাংলাদেশে গ্যাস সম্পদের সংকট নতুন নয়, তবে এবারের ঘোষণায় তা নতুন দিক নিয়েছে। গৃহস্থালি পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের এই নীতিকে কেউ বাস্তবসম্মত বলছেন, কেউ বলছেন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট – দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ এখন বিকল্প উৎস ও সাশ্রয়ের ওপরই নির্ভর করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *