মুদ্রাস্ফীতি কমলেও বাড়ল দারিদ্র্য: বিশ্বব্যাংকের তথ্য, ২১.২ শতাংশ মানুষ এখন দরিদ্র

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পেলেও দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাওয়ার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলমান ২০২৫ অর্থবছরে দেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.২ শতাংশে, যা গত ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ২০.৫ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে প্রায় ০.৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ এবং ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণ: কর্মসংস্থান সংকট ও নারীর অংশগ্রহণ হ্রাস
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার এখনও মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে কর্মসংস্থানের বাজারে মন্দা এবং শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়া।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার কমেছে ৬০.৯ শতাংশ থেকে ৫৮.৯ শতাংশে। এই পতনের পেছনে প্রধানত নারীদের অংশগ্রহণ হ্রাসকে দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারের বাইরে চলে গেছেন, যার মধ্যে প্রায় ২৪ লাখই নারী। এটি দেশে নারীর কর্মসংস্থান সংকটের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
নিম্ন আয়ের পরিবারে দুর্ভোগ চরমে
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকটের কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে, ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক খাতে প্রভাব পড়ছে। বহু পরিবার বাধ্য হয়ে ধার-দেনা করছে বা সঞ্চয় ভেঙে ফেলছে, যা তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও অনুমান করা হয়েছে, যাদের দৈনিক আয় ২ ডলার ১৫ সেন্টের নিচে (অর্থাৎ অতি দরিদ্র), সেই জনগোষ্ঠীর হারও বেড়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অতিরিক্ত ৩০ লাখ মানুষ অতি দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও চ্যালেঞ্জ
চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.৮ শতাংশ হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই হার সত্ত্বেও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাওয়া দেশের উন্নয়নের ধারা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো না গেলে দারিদ্র্যের মাত্রা আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তা জালকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
জনগণের ওপর এই অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *