স্বপ্নের ইউরোপ নয়—লিবিয়া মানব পাচার থেকে জীবন্ত কঙ্কাল হয়ে দেশে ফেরা দুই তরুণের করুণ প্রত্যাবর্তন

পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন তারা, কিন্তু লিবিয়ার মরুভূমিতে হারিয়ে গেলো জীবনের রঙ—অবশেষে ২০ লাখ টাকার মুক্তিপণে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরলেন দুই তরুণ বাংলাদেশি।


বুকভরা আশা আর চোখে ইউরোপের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন তারা। পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে, মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে, প্রিয়জনের জন্য একটু নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে। কিন্তু ভাগ্য লিখে রেখেছিল ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতা।
লিবিয়ার মরুভূমিতে, মানবপাচারকারীদের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নয় মাস পর জীবন্ত কঙ্কাল হয়ে দেশে ফিরলেন দুই তরুণ বাংলাদেশি—ঝিনাইদহের মতিউর রহমান সাগর ও কুষ্টিয়ার তানজির শেখ।

সাগর আর তানজিরের শরীরের প্রতিটি হাড়ে, প্রতিটি দাগে লুকিয়ে আছে অকথ্য নির্যাতনের গল্প। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, চোখে আতঙ্কের ছাপ—তবু তারা বেঁচে ফিরেছেন, এটাই যেন অলৌকিক এক প্রত্যাবর্তন।

বুরাক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট (UZ222) যোগে তারা দেশে ফেরেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিমানের দরজা খুলতেই পরিবারের কান্নায় ভেঙে পড়ে বিমানবন্দর প্রাঙ্গণ।
যে ছেলেরা একদিন পরদেশে সুখের আশায় পাড়ি দিয়েছিল, আজ তারা ফিরে এসেছে মৃত্যুর ছায়া থেকে।

লিবিয়ার নরকযন্ত্রণার গল্প
নয় মাসের বন্দিজীবনে তারা দেখেছেন ভয়াবহ নির্যাতন—খাবার হিসেবে শুকনো রুটি, পানির অভাবে অসুস্থতা, আর মুক্তিপণের জন্য প্রতিদিনের মারধর। পাচারকারীরা ফোনে পরিবারের সামনে তাদের ওপর নির্যাতন চালাতো, যেন ভয় আর অশ্রু দিয়েই উঠে আসে মুক্তিপণের টাকা।
অবশেষে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে ২০ লাখ টাকা পরিশোধের পর তাদের মুক্তি মেলে।

মতিউর রহমান সাগর বলেন,

“প্রতিদিন মনে হতো আজই শেষ দিন। আমরা ইউরোপের স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিন্তু সেখানে পেয়েছি কেবল মৃত্যু আর অন্ধকার।”


বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ যাওয়ার আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র অসহায় তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর পথে। কেউ হারিয়ে যাচ্ছে সাগরে, কেউ বন্দি হচ্ছে মরুভূমির নরকে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর শতাধিক বাংলাদেশি লিবিয়া, টিউনিসিয়া ও আলজেরিয়ায় পাচারের শিকার হন। অধিকাংশই আর ফিরে আসতে পারেন না।
এই দুই তরুণের কঙ্কালসার শরীর শুধু তাদের দুর্ভোগের গল্প নয়—এটি আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও বিবেকের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন।
কেন এখনো মানবপাচারকারীরা এভাবে তরুণদের জীবন কেড়ে নিতে পারে? কেন বিদেশযাত্রার নামে এমন ভয়াবহ প্রতারণা চলতে থাকে?

সরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানো, পাচারচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা তৈরিই এখন সময়ের দাবি।
নচেৎ আরও অনেক সাগর, আরও অনেক তানজির হয়তো আগামীকাল কঙ্কাল হয়ে ফিরবে নিজের মায়ের কোলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *