রাকসু নির্বাচন ২০২৫: নতুন নেতৃত্ব না পুরনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি?

তিন দশক পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির জোয়ার — শিবির-সমর্থিত মোস্তাকুর-সালমানের জয়, জিএস পদে স্বতন্ত্র আম্মারের উত্থান নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে

✍️ লেখক: সম্পাদকীয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন ২০২৫ তিন দশক পর অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাট প্রত্যাশা তৈরি করেছিল।
ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে, শিবির-সমর্থিত “সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট” ভিপি ও এজিএসসহ বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ পদে জয় পেয়েছে।
অন্যদিকে, জিএস পদে স্বতন্ত্র ও সাবেক সমন্বয়ক আম্মার হোসাইনের জয় ক্যাম্পাস রাজনীতিতে একটি নতুন বার্তা দিয়েছে।

এই ফলাফল কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়—এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘস্থায়ী ছাত্র রাজনীতির কাঠামোয় এক মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

🔹 নির্বাচনের চিত্র:

এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৩শ’, ভোট পড়েছে প্রায় ৭৪ শতাংশ
এটি প্রমাণ করে যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রবল।

ভোটের ফলাফলে দেখা যায়—

  • ভিপি পদে মোস্তাকুর রহমান (শিবির-সমর্থিত) বিপুল ব্যবধানে জয়ী।
  • এজিএস পদে সালমান হোসাইন একই প্যানেল থেকে জয় পেয়েছেন।
  • জিএস পদে সাবেক সমন্বয়ক আম্মার হোসাইন স্বতন্ত্রভাবে জয়ী হয়েছেন।

এটি এক অর্থে সংগঠন ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার সমন্বিত প্রতিফলন

🔹 শিবির-সমর্থিত জোটের উত্থান: ‘নৈতিক নেতৃত্বের’ প্রচারণা ফল দিয়েছে

এই নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল নিজেদের প্রচারণায় “নৈতিক নেতৃত্ব ও শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা”কে মুখ্য বার্তা হিসেবে তুলে ধরে।
তাদের কার্যক্রমে ছিল সংগঠিত প্রচার, অনলাইন ভোটার যোগাযোগ, এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক ভোট বিশ্লেষণ।
অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলগুলো বিভক্ত থাকায় একক ভোটব্লক গঠন করতে ব্যর্থ হয়।

এতে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মনে করেছে—যে দলই হোক, দরকার সক্রিয় ও দৃশ্যমান নেতৃত্ব, যা মোস্তাকুর-সালমানের প্রচারণায় প্রতিফলিত হয়েছে।

🔹 জিএস আম্মারের জয়: স্বতন্ত্রতার বিজয়

জিএস পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আম্মারের জয় একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছে—
শিক্ষার্থীরা এখন বড় ব্যানারের বাইরে, ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও কর্মতৎপরতার মূল্যায়ন করতে জানে।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিক ইস্যুতে সক্রিয় থেকে ক্যাম্পাসে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন।
ফলে অনেক নিরপেক্ষ শিক্ষার্থী তাঁর প্রতি আস্থা রেখেছেন, যা ভোটে প্রতিফলিত হয়েছে।

🔹 নারী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনা

নির্বাচনে নারী ভোটারের অংশগ্রহণ বেড়েছে, যা রাকসুর ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে নারীর সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ধর্ম, রাজনীতি বা আদর্শ—এসবের বাইরে গিয়ে কর্মদক্ষতা, জবাবদিহিতা ও বাস্তব নেতৃত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

🔹 বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধ দিক

ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু হলে প্রবেশে বাধা ও প্রচারে বাঁধার অভিযোগ উঠেছে।
তবে রাকসু নির্বাচন কমিশনের দাবি, পুরো প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ
শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে যে উদ্দীপনা দেখা গেছে, তা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

🔹 বিশ্লেষণ: রাকসুর রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

রাকসু নির্বাচন ২০২৫ তিনটি বিষয়কে স্পষ্ট করেছে—
১️⃣ ক্যাম্পাস রাজনীতি এখনো শিক্ষার্থীদের কাছে প্রাসঙ্গিক।
২️⃣ দলীয় প্রভাবের বাইরেও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
৩️⃣ শিক্ষার্থীরা নতুন ধারার রাজনীতিকে স্বাগত জানাচ্ছে।

এতে একদিকে যেমন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনরুত্থান, অন্যদিকে স্বতন্ত্র ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের উত্থান—দুটি প্রবণতাই সমানভাবে পরিলক্ষিত।

রাকসু নির্বাচন ২০২৫ কেবল একটি ভোট উৎসব নয়—এটি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক চেতনার পুনর্জন্ম।
যদি নবনির্বাচিত নেতৃত্ব—মোস্তাকুর, সালমান ও আম্মার—সত্যিই শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারে, তবে রাকসু আবারও হয়ে উঠতে পারে জাতীয় নেতৃত্বের একটি প্রতীকী প্রশিক্ষণক্ষেত্র।
কিন্তু যদি দলীয় স্বার্থ, ব্যক্তিগত প্রভাব ও প্রশাসনিক অনুগততা ফিরে আসে—তবে এই আশার অগ্নিশিখা আবারও নিভে যাবে পুরনো ছাইয়ের নিচে।

“রাকসু এখন কেবল নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা নয়—এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনার প্রশ্ন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *