বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভীত রচনা করেছেন যারা, তাঁদের নাম শিক্ষক। গ্রামের কাঁচা রাস্তা থেকে শহরের ব্যস্ত নগর পর্যন্ত—শিক্ষকরা মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালাতে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, এই জাতি গঠনের কারিগরদের জীবন চলছে অবহেলা, বৈষম্য আর বঞ্চনার কষ্টকর ছায়ায়। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকেরা—যাঁরা সংখ্যায় সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি—আজও ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
সরকারি শিক্ষকদের জন্য বাড়ি ভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা এবং নানা ভোগ্য সুবিধা বরাদ্দ রয়েছে। অথচ বেসরকারি শিক্ষকরা পান শুধু নামমাত্র বেতন, যা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির এ যুগে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। ভাড়ার বাজারে আগুন—রাজধানীতে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট নিতে যেখানে কয়েক হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয়, সেখানেই একজন কলেজ বা মাদ্রাসার শিক্ষক তাঁর মাসিক বেতনের অর্ধেকের বেশি হারিয়ে ফেলেন শুধু ঘর ভাড়ার পেছনে। ঘর যদি কেবল দেয়াল আর ছাদের নাম হতো, তবে হয়তো কষ্ট সহ্য করা যেত। কিন্তু ঘর মানে নিরাপত্তা, স্বপ্নের আশ্রয়, সন্তান পালনের স্থান। যখন সেই ঘর ভাড়ার বোঝা শিক্ষককে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে, তখন জাতি আসলেই লজ্জিত হওয়া উচিত।

শুধু ঘর ভাড়ার চাপ নয়, আরও ভয়ঙ্কর বাস্তবতা হলো চিকিৎসা ভাতা না থাকা। এই সময়ে চিকিৎসা খরচ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে মধ্যবিত্ত মানুষও নাজেহাল, আর নিম্ন আয়ের মানুষ দিশেহারা। অথচ একজন বেসরকারি শিক্ষক, যিনি তাঁর ছাত্রছাত্রীকে নৈতিকতা শেখান, মানবিক হতে শেখান, জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে দেন—তাঁকে নিজের অসুস্থতা লুকিয়ে রাখতে হয় ওষুধ কেনার সামর্থ্য না থাকায়। কত শিক্ষক আছেন যাঁরা ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হয়েও নিয়মিত ওষুধ খান না শুধু অর্থাভাবের কারণে। কত সন্তান আছেন, যাঁরা বাবার বা মায়ের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পেরে চোখের সামনে তাঁদের ধুঁকে যেতে দেখেন। এ দৃশ্য মানবিকতার জন্য এক লজ্জাজনক পরিণতি।
একজন বেসরকারি শিক্ষক হয়তো ক্লাসে দাঁড়িয়ে বলছেন—“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”। অথচ তাঁর নিজের মেরুদণ্ড আজ ভেঙে যাচ্ছে দুঃসহ জীবনযাত্রার চাপে। সমাজে যাঁরা মানুষকে আলোকিত করেন, তাঁদের জীবনে যদি অন্ধকার ঘিরে ধরে, তবে সেই অন্ধকার ছড়িয়ে পড়বে জাতির ভেতরেও। শিক্ষা হবে কেবল চাকরি পাওয়ার একটি মাধ্যম, যেখানে থাকবে না সৃষ্টিশীলতা, মানবিকতা কিংবা জাতি গঠনের শক্তি।
তাহলে কি আমরা শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা করে জাতির ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছি না? সরকার যখন বড় বড় প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে, তখন কি সম্ভব নয় বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা চালু করা? জাতি যদি সত্যিই শিক্ষাকে মেরুদণ্ড মনে করে, তবে সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করার এখনই সময়।
আজ প্রয়োজন শুধু ভাতা নয়, প্রয়োজন শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া। প্রয়োজন তাঁদের জীবনকে নিরাপদ করা। একজন শিক্ষক যদি শান্তিতে পরিবার নিয়ে বাঁচতে পারেন, তবে তিনি দ্বিগুণ মনোযোগ দিয়ে তাঁর ছাত্রদের মানুষ করতে পারবেন। আর সেখান থেকেই জন্ম নেবে উন্নত, মানবিক ও জ্ঞানসমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
শিক্ষক অবহেলিত হলে জাতি অবহেলিত হয়—এ সত্য আমরা বারবার ভুলে যাচ্ছি। এখন সময় এসেছে ভুল শোধরানোর। বেসরকারি শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা চালু করা শুধু তাঁদের ন্যায্য অধিকার নয়, এটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।